হাবিব রহমানঃ জাপান এমন এক দেশ যেখানে নিয়ম-কানুন শুধু আইনে নয়, সংস্কৃতি ও মানসিকতার গভীর শিকড়ে গাঁথা। বিদেশিদের কাছে এই নিয়মগুলো অনেক সময় অবাক করা মনে হয়।
টোকিওর এক সকাল। রাস্তায় নামতেই প্রথম চমকটা খেলাম—ব্যস্ত শহর, অথচ আশ্চর্য নীরবতা। হাজার মানুষ চলেছে, ট্রেন ছুটছে মিনিটের নির্ভুলতায়, কিন্তু কোথাও হট্টগোল নেই। মনে হলো, শহরটা যেন কোনো অদৃশ্য সুরে বাঁধা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ তার নিজের ছন্দে নিঃশব্দে বাজছে।
জাপানে হাঁটতে হাঁটতে বা ট্রেনে বাসে খাওয়া অভদ্রতা হিসেবে ধরা হয়। খাবার মানেই বসে শান্তভাবে খাওয়া — তা হোক পার্কে, অফিসে বা রেস্তোরাঁয়।
স্টারবাকস থেকে এক কাপ কফি নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিলাম। হঠাৎ পাশের এক জাপানি ভদ্রলোক চোখে ইশারা করে জানালেন—“ওটা এখানে নয়।” বুঝলাম, রাস্তার হেঁটে কফি খাওয়া এখানে অনুচিত। খাওয়া মানেই নির্দিষ্ট জায়গায় বসে, মনোযোগ দিয়ে খাওয়া। সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম—ওদের জন্য খাওয়াও একপ্রকার ধ্যান।
ট্রেনে টোকিও থেকে হিরোশিমা যাচ্ছি।চোখে পড়লো অদ্ভুত দৃশ্য—পুরো কামরা ভরা মানুষ, অথচ সবার মুখে নীরবতা। কেউ ফোনে কথা বলছে না, কেউ হাসছে না। সবাই নীরবে বই পড়ছে, কিংবা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
ট্রেনে পাশাপাশি দুটো করে সীট।আমার পাশের সীটে বসা তরুণীকে দেখলাম নিঃশব্দে বই পড়ছে,।অন্য কেউ ফোনে নয়, চোখে চোখও নয়—সবাই নিজের জগতে ডুবে। জাপানীরা বিশ্বাস করে, “নীরবতা হলো সম্মানের ভাষা।”
পরে জেনেছিলাম ট্রেন, বাস বা পাবলিক প্লেসে ফোনে কথা বলা খুবই অশোভন বলে গণ্য হয়। মানুষজন সাধারণত মেসেজ করে কথা বলে বা নীরবে যাত্রা করে।
প্রায় সব জাপানি ঘর, স্কুল এমনকি কিছু রেস্তোরাঁয়ও জুতো খুলে ঢুকতে হয়। এটি পরিচ্ছন্নতা ও সম্মানের প্রতীক।
জাপানে আমার ট্যুর গাইড একদিন দাওয়াত করলো তার বাড়ীতে।দরজার সামনে পৌঁছাতেই তিনি হেসে বললেন, “জুতো খুলে আসুন।” আমি অবাক হয়ে দেখলাম, ঘরের ভেতর একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার। পরে জানলাম, তাদের কাছে বাইরে হাঁটা জুতার ধুলো মানে অশুদ্ধতা।
রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েও পেলাম এক নতুন শিক্ষা। বিল মেটানোর পর টিপস দিতে যেতেই ওয়েটার হালকা মাথা নুইয়ে বলল, “না, ধন্যবাদ।” জাপানে ভালো সেবা মানেই কর্তব্য, টিপস নয়—এ যেন এক সংস্কৃতির মাধুর্য, যা টাকার চেয়ে বেশি দামী।রেস্তোরাঁ, ট্যাক্সি বা হোটেলে কাউকে টিপস দিলে তারা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। ভালো সেবার জন্য টিপস নয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশই যথেষ্ট বলে তারা মনে করে।











