টোকিওর এক দুপুরে আমি হাঁটছিলাম গিনজার চকচকে রাস্তায়। হাতে এক কাপ কফি, চারপাশে মানুষের ভিড়, আলো-নীয়নে ঝলমল করছে শহর।
কফি শেষ হতেই খুঁজতে লাগলাম একটি সাধারণ জিনিস—ডাস্টবিন।কিন্তু অবাক কান্ড কোথাও খুঁজে পেলাম না!
একটা শহর, যেখানে মানুষ লাখে লাখে হাঁটে, যেখানে প্রযুক্তি আকাশ ছুঁয়েছে—সেখানে কেন নেই রাস্তায় ডাস্টবিন?আরও বিস্ময়—তবু নেই কোথাও ময়লা।
এক তরুণীকে দেখলাম, খালি পানির বোতল ব্যাগে ঢুকিয়ে নিচ্ছে।জিজ্ঞেস করতেই সে হেসে বলল-এটা আমার ময়লা, আমি বাড়ি নিয়ে যাব।
এই এক বাক্যেই বুঝে গেলাম, পরিচ্ছন্নতার রহস্যটা কোথায়।জাপানে কেউ নিজের ময়লা রাস্তায় ফেলে না, কারণ তারা মনে করে—যা আমার থেকে এসেছে, তার দায়ও আমার।
এই বৈপরীত্যের উত্তর খুঁজতে হলো আমার ট্যুর গাইড নিকিতার কাছে।
তিনি জানান,১৯৯৫ সালে টোকিও মেট্রোতে ভয়াবহ সারিন গ্যাস হামলার পর সারা দেশজুড়ে ডাস্টবিন তুলে ফেলা হয়।কিন্তু তার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতাও উধাও হয়নি।বরং মানুষ আরও দায়িত্বশীল হয়ে উঠেছে—ময়লা নিজের কাছে রাখে, পরে ঘরে বা অফিসে ঠিকভাবে ফেলে দেয়।
পার্কে গিয়ে দেখেছি তিনটি আলাদা বাক্স—একটিতে প্লাস্টিক, একটিতে ক্যান, আরেকটিতে কাগজ।কেউ ভুল জায়গায় কিছু ফেলছে না।জাপানীরা বর্জ্য আলাদা করে ফেলে, যাতে পুনঃব্যবহার সহজ হয়।
হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবছিলাম—
এই শহরে কেউ চিৎকার করে বলে না “ময়লা ফেলো না”।তবু সবাই জানে কী করতে হবে।
টোকিওর রাস্তা তাই ঝকঝকে, মসৃণ।
এ যেন এক নিঃশব্দ শৃঙ্খলার কবিতা,যেখানে প্রতিটি নাগরিক কবির মতো সযত্নে লিখছে নিজের ভূমিকা।
বিকেলের আলোয় যখন শিবুয়া ক্রসিং পেরোচ্ছিলাম, হাতে খালি কফির কাপ,
তখন আমিও কাপটা ব্যাগে রাখলাম।
হঠাৎ মনে হলো, আমিও যেন একটু “জাপানি” হয়ে গেছি।
কারণ বুঝে গিয়েছিলাম—পরিচ্ছন্নতা এখানে কোনো সরকারি প্রকল্প নয়,এটি এক অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধ,যা শুরু হয় নিজের ভিতর থেকে।
উপহার দুটি হাতে দিতে হয়, প্যাকেট খোলা হয় পরে, কখনোই উপহার দাতার সামনে বসে নয়। কারণ, সামনে খোলা অসম্মানের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়।
একদিন আমার ট্যুর গাইড আমাকে একটি ছোট প্যাকেট দিলেন, দু’হাতে করে। আমি খুলতে যেতেই তিনি মৃদু হেসে বল্লেন-“পরে খুলবেন।”
পরে বুঝলাম ওদের কাছে উপহার মানে শুধুই বস্তু নয়—সম্মানের প্রকাশ। সামনে খুলে ফেলা মানে যেন কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সৌন্দর্য নষ্ট করা।
জাপানে সময়ের মূল্য আমি নতুনভাবে শিখেছি। ট্রেন ঠিক নির্ধারিত সময়ে ছাড়ে, অফিসে দেরি মানে অসম্মান।
আমার গাইড জানান,একবার মাত্র দুই মিনিট দেরি হওয়ায় একজন ট্রেনচালক যাত্রীদের কাছে লিখিত ক্ষমা চেয়েছিলেন।
জাপানীরা “সুমিমাসেন” (দুঃখিত) শব্দটি প্রায়ই ব্যবহার করে— এমনকি ক্ষুদ্র ভুলের জন্যও। বিনয় তাদের সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একদিন আকিয়াবারার ব্যস্ত রাস্তা পার হওয়ার সময় সামান্য ধাক্কা লাগতেই লোকটি হালকা নুয়ে বলল, “সুমিমাসেন।”এই একটি শব্দ—দুঃখপ্রকাশ, ধন্যবাদ, সৌজন্য—সবকিছুর প্রকাশ। যেন বিনয়ের এক ভাষা, যা পুরো জাতির মর্মে বেঁচে আছে।
একদিন টোকিওর শিবুয়া ক্রসিংয়ের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে মনে হলো—এই সমাজের সৌন্দর্য আসলে তাদের নীরব নিয়মেই।এরা আইন মানে শাস্তির ভয়ে নয়, সৌন্দর্যের জন্য।শৃঙ্খলা, নীরবতা, পরিচ্ছন্নতা—সব মিলিয়ে জাপান যেন এক চলমান কবিতা, যার প্রতিটি শব্দ “সম্মান” দিয়ে লেখা।
দিনের শেষে টোকিওর আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এই শহরটা যেন নিয়মের নয়, শ্রদ্ধার। সময়, নীরবতা, পরিচ্ছন্নতা—সবকিছু তারা ভালোবাসে ভেতর থেকে।এ এক এমন সমাজ, যেখানে শৃঙ্খলা কোনো বাধা নয়, বরং জীবনযাপনের এক নান্দনিক রূপ।











